ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এই ভিটামিন আমাদের রক্তকণিকা, স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।
ঘাটতি হলে প্রথমে সামান্য দুর্বলতা বা ক্লান্তি দেখা দেয়, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, স্নায়বিক সমস্যা, স্মৃতিভ্রম, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো জটিল রোগ তৈরি হতে পারে।
তাই “ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে কোন রোগ হয়” বোঝা ও সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আজকের ব্লগে আমরা বিস্তারিত জানব ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে কী কী রোগ হয়, এর লক্ষণগুলো কী কী ও প্রতিকার।
ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে যে রোগ ও সমস্যাগুলো হয় (Listicle Style)

ভিটামিন বি ১২ এর অভাব কেবল সামান্য দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
নিচে ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে হওয়া প্রধান রোগ গুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
১. মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা)
ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা হলো রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া। এই ভিটামিনের অভাবে শরীরে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) সঠিকভাবে তৈরি হতে পারে না।
ফলে রক্তকণিকাগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং সুস্থভাবে কাজ করতে পারে না। এতে শরীরের টিস্যুগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, ফলে শরীর চরম ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. স্নায়বিক সমস্যা বা পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি
বি ১২ আমাদের স্নায়ুর সুরক্ষাকবচ ‘মায়োলিন’ (Myelin) তৈরিতে সাহায্য করে। এর অভাব হলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হাত-পা ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব বা সুঁই ফোটার মতো অনুভূতি হতে পারে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বলা হয়।
৩. স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়া
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে ভিটামিন বি ১২ অত্যন্ত জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের ঘাটতি থাকলে মানুষের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বা স্মৃতিভ্রম হতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি আলঝেইমার্স রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
৪. গ্লসাইটিস এবং মুখের ঘা
আপনার জিহ্বা যদি অস্বাভাবিক লাল হয়ে যায়, ফুলে যায় বা মসৃণ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে এটি ভিটামিন বি ১২ এর অভাবজনিত লক্ষণ। একে গ্লসাইটিস বলা হয়। এছাড়া বারবার মুখে আলসার বা ঘা হওয়া এই ভিটামিনের ঘাটতির বড় সংকেত।
৫. দৃষ্টিশক্তি হ্রাস (অপটিক নিউরোপ্যাথি)
বিরল হলেও বি ১২ এর তীব্র অভাবে চোখের অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হয়ে যাওয়া বা ঝাপসা দেখার সমস্যা তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি স্থায়ী দৃষ্টিশক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
৬. বিষণ্নতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা
এই ভিটামিনটি মস্তিষ্কের ‘সেরোটোনিন’ এবং ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন (যা আমাদের মন ভালো রাখে) তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর অভাবে অকারণে মন খারাপ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, খিটখিটে মেজাজ এমনকি গভীর বিষণ্নতা (Depression) তৈরি হতে পারে।
৭. ভারসাম্যহীনতা ও হাঁটাচলায় সমস্যা
স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে বারবার পড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
ভিটামিন বি ১২ এর অভাব বোঝার সাধারণ লক্ষণসমূহ
রোগগুলো বড় আকার ধারণ করার আগে শরীর কিছু সংকেত দেয়। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি: সারাদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা দুর্বল লাগা।
- ত্বকের রঙ ফ্যাকাশে হওয়া: রক্তস্বল্পতার কারণে ত্বক হলদেটে বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া (একে অনেকটা জন্ডিসের মতো মনে হতে পারে)।
- শ্বাসকষ্ট: অল্প পরিশ্রমেই বুক ধড়ফড় করা বা হাঁপিয়ে ওঠা।
- মাথা ঘোরা: হঠাৎ করে মাথা ঘুরে ওঠা বা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।
- হজমজনিত সমস্যা: কোষ্ঠকাঠিন্য বা হজমে গোলমাল হওয়া।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
সবাই ভিটামিন বি ১২ এর অভাবে ভুগতে পারেন না। নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ঝুঁকি বেশি থাকে:
- নিরামিষভোজী (Vegetarians/Vegans): যেহেতু বি ১২ মূলত প্রাণিজ খাবারে থাকে, তাই যারা মাংস, মাছ বা ডিম খান না, তাদের ঘাটতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
- বয়স্ক ব্যক্তি: বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাকস্থলী থেকে এই ভিটামিন শোষণের ক্ষমতা কমে যায়।
- পাকস্থলীর অপারেশন: যারা ওজন কমানোর জন্য গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারি করিয়েছেন।
- নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ: দীর্ঘদিন যারা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বা ডায়াবেটিসের ওষুধ (মেটফরমিন) সেবন করেন।
ভিটামিন বি ১২ এর অভাব প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
ভিটামিন বি ১২ এর অভাব মেটানো খুব কঠিন কাজ নয়। এর জন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
১. সঠিক খাদ্য নির্বাচন
শরীরে ভিটামিন বি ১২ এর যোগান দিতে আপনার পাতে নিচের খাবারগুলো রাখুন:
- প্রাণিজ উৎস: গরুর কলিজা, চর্বিহীন মাংস এবং মুরগির মাংস।
- সামুদ্রিক মাছ: টুনা, স্যামন এবং রূপচাঁদা জাতীয় মাছ।
- ডিম ও দুগ্ধজাত খাবার: দুধ, দই এবং পনির।
- ফোর্টিফাইড ফুড: কিছু সিরিয়াল বা খাদ্যশস্যে আলাদাভাবে ভিটামিন যুক্ত করা থাকে, যা নিরামিষাশীদের জন্য ভালো উৎস।
২. সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ
যদি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে যে ঘাটতি অনেক বেশি, তবে চিকিৎসক আপনাকে ওরাল ট্যাবলেট বা বি ১২ ইনজেকশন দিতে পারেন। এটি খুব দ্রুত শরীরের ভিটামিন স্তর স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
৩. নিয়মিত চেকআপ
যাদের ঝুঁকি বেশি (যেমন নিরামিষাশী বা বয়স্ক), তাদের বছরে অন্তত একবার রক্ত পরীক্ষা (Vitamin B12 Serum Test) করানো উচিত।
শেষ কথা
ভিটামিন বি ১২ এর অভাব প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ মনে হলেও অবহেলা করলে এটি স্থায়ী স্নায়বিক পঙ্গুত্ব বা হার্টের সমস্যার কারণ হতে পারে।
তাই সুষম খাবার খান এবং কোনো দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ শরীরই সুন্দর জীবনের চাবিকাঠি।
আপনি কি সম্প্রতি নিজের মধ্যে এমন কোনো লক্ষণ লক্ষ্য করেছেন? অথবা আপনি কি জানতে চান কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি ১২ পাওয়া যায়? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন।

- Latest Posts by Dr. Md. Sekender Ali
-
কোন ভিটামিনের অভাবে ঘুম কম হয়? জানুন ও সমাধান করুন!
- -
কোন ভিটামিন খেলে চেহারা সুন্দর হয়? ক্যাপসুল/সিরাপ? ২০২৬
- -
নিম পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা: ব্যবহারও ক্ষতিকর দিক
- All Posts
